আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর: অবক্ষয়িত সমাজে এক নির্লিপ্ত ধ্রুবতারা
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
আমাদের জাতীয় মনন ও চিন্তার আকাশে তিনি এমন এক জ্যোতিষ্ক, যার আলো চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অন্ধকার দূর করে চলেছে। তিনি অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। ১৯৩৯ সালে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি কেবল একজন শিক্ষক বা সংগঠক নন, বরং তিনি একটি চলন্ত বিপ্লব—যে বিপ্লবের হাতিয়ার কোনো আগ্নেয়াস্ত্র নয়, বরং একটি করে বই। তেইশ বছর বয়সে কলেজের দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া থেকে শুরু করে ঢাকা কলেজের বারান্দায় সেই যে মুক্তচিন্তার বীজ তিনি বুনেছিলেন, তা আজ মহীরুহ হয়ে সমাজকে ছায়া দিচ্ছে।
ষাট ও সত্তরের উত্তাল সময়ে যখন চারদিকে নতুন সুরের সন্ধান চলছে, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তখন ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকার মাধ্যমে নবীন কলমযোদ্ধাদের এক শক্তিশালী ভিত গড়ে দিয়েছিলেন। এরপর টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর সেই চিরচেনা বাচনভঙ্গি ও মননশীল উপস্থাপনা মানুষের ড্রয়িংরুম পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল গভীর জীবনবোধ। কিন্তু তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়টি রচিত হলো ১৯৭৮ সালে, যখন সেগুনবাগিচার এক চিলতে টিনের ঘরে ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’-এর চারা রোপণ করেছিলেন তিনি। চারপাশের মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখে তিনি থমকে যাননি, বরং বিশ্বাস করেছিলেন—একমাত্র জ্ঞানের আলোই পারে মানুষকে তার পূর্ণতায় পৌঁছে দিতে।
আজকের বাংলাদেশের প্রান্তিক গ্রাম থেকে শুরু করে আধুনিক শহর, সর্বত্র যে ভ্রাম্যমাণ পাঠাগারের গাড়িগুলো ধুলো উড়িয়ে ছুটে চলে, তা আসলে মানুষের দ্বারে দ্বারে স্বপ্ন পৌঁছে দেওয়ার এক নিরন্তর মহড়া। ১৯৯৮ সাল থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, একটি জাতিকে উন্নত করতে হলে শুধু ইমারত গড়লেই হয় না, তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন মানুষের ভেতরের ‘আলোকিত সত্তা’কে জাগিয়ে তোলা।
অবশ্য পথটি সব সময় মসৃণ ছিল না। রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে তিনিও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। আমাদের সমাজে দেবতাজ্ঞান করা কিংবা মুহূর্তেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর যে সংস্কৃতি, তার আঁচ তাঁর গায়েও লেগেছে। কিন্তু সায়ীদ সাহেব নিজেকে ভেঙেছেন, গড়েছেন এবং প্রচলিত সমাজব্যবস্থার বাইরে দাঁড়িয়ে সবসময় প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন প্রথাবদ্ধতাকে। ম্যাগসেসে পুরস্কার কিংবা একুশে পদক তাঁর অর্জনের সীমানা নয়, বরং তাঁর প্রকৃত সার্থকতা নিহিত রয়েছে সেই লাখো তরুণের চোখে, যারা তাঁর হাত ধরে প্রথম বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শিখেছে।
বৌদ্ধিক সততা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির এই প্রতীক আজও আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার এক বিশাল দর্পণ। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ নামক সেই প্রদীপটি আজ আর কোনো ব্যক্তি নন, বরং একটি জাতির উত্তরণের মানচিত্র। আগামী দিনেও যখন কোনো তরুণ অন্ধকার পথে হোঁচট খাবে, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জ্বালানো সেই জ্ঞানের বাতিঘরটিই হবে তার সঠিক পথের দিশারি।